ধেয়ে আসছে সুপার সাইক্লোন আমফান

বাংলাদেশের উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আমফান। এটি ইতিমধ্যে ‘সুপার ঘূর্ণিঝড়ে’ পরিণত হয়েছে। চলতি শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া এটিই প্রথম সুপার ঘূর্ণিঝড়। এর আগে ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরও সুপার ঘূর্ণিঝড় ছিল না।




সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটারের বেশি হলে তাকে সুপার সাইক্লোন হিসেবে ঘোষণা দেয় ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি)। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরও একে সুপার ঘূর্ণিঝড় হিসেবে অভিহিত করেছে। সংস্থাটি গতকাল রাত নয়টা পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলছে, সুপার ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৫ থেকে ২৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হচ্ছে।

আমফান নামটি কোথা থেকে এলো?

আমফান অর্থ শক্তিমান বা শক্তিশালী। এটি থাই শব্দ। থাইল্যান্ডের আবহাওয়াবিদেরা এই নামটি দিয়েছেন। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশের আবহাওয়াবিদেরা মিলে ৬৪টি ঘূর্ণিঝড়ের নামের একটি তালিকা করেছিলেন। ওই তালিকার সর্বশেষটি ছিল আমফান । এরপর সাগরে যে ঝড় তৈরি হবে, সেটি নতুন তালিকা থেকে ঠিক করা হবে।

সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি

চিত্রঃআমফান এর বর্তমান অবস্থান 


আইএমডির মহাপরিচালক মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র বলেন এই শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে এটিই প্রথম সুপার ঘূর্ণিঝড়। ভারত ও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আঘাতের সময় এর গতিবেগ কমতে পারে। তারপরও এর গতি ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার চেয়ে বেশি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের হাতিয়াসহ পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলো উঁচু জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। একই সঙ্গে মূল আঘাতটি সুন্দরবনসংলগ্ন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের খুলনা-সাতক্ষীরা এলাকায় হতে পারে।
Source: bangla.dhakatribune.com

১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোনে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা গেছে। ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যায়। প্রায় একই ধরণের আরেকটি ঘূর্ণিঝড় ছিল ২০০৭ সালে সিডর। সেখানে মানুষের মৃত্যু হার তুলনামূলক কম ছিল। ওই ঘূর্ণিঝড়ে ৩ হাজার ৪০৬ জন মারা গিয়েছিল।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এ কে এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় আমফান প্রায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বঙ্গোপসাগরে শক্তি অর্জন করছে। এখন পর্যন্ত তার গতি–প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, এটি সিডরের মতোই প্রবল শক্তিশালী ঝড় হিসেবে বাংলাদেশে আঘাত করতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের আমফান–সংক্রান্ত যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫১টি জেলায় আমফানের প্রভাব পড়তে পরে। তবে উপকূলের ২৪ জেলায় ঝড়ের প্রভাবে ফসল ও জনজীবনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।

কোথায় আঘাত হানতে পারে আমফান  ?


আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং এসব জেলার কাছের দ্বীপ ও চরের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪-৫ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়টি অতিক্রমকালে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম জেলায় অতিভারী বৃষ্টিসহ ঘণ্টায় ১৪০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
উত্তর উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে কাল ভোররাত থেকে বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

আমফানের গতিবেগ কত?

ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৫ থেকে ২৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হচ্ছে।

Source: www.ittefaq.com.bd
পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুপার সাইক্লোন আমফান   উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে একই এলাকায় অবস্থান করছে। এটি মঙ্গলবার সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৮৫ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৯৫ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৩০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ৭২৫ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছিল।

ঝড়টি ভারতের দীঘা থেকে বাংলাদেশের সন্দ্বীপ এলাকার মধ্য দিয়ে যাবে এবং এর মূল অংশ ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের সুন্দরবন অংশে আসবে। এ অবস্থায় মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

কোথায় কোন বিপদ সংকেত?

উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫ থেকে ১০ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম জেলা সমূহ এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণসহ ঘণ্টায় ১৪০ থেকে ১৬০ কিমি বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

আমফান মোকাবেলায় প্রস্তুতি 
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতিসত্ত্বর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

চিত্র: আমফান প্রস্তুতি 
উপকূলীয় ১৩ জেলায় ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় ৩৯ কোটি টাকা পাঠিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। এই টাকার মাধ্যমে জরুরি খাবার, পানি সরবরাহের পাশাপাশি মাস্ক, স্যানিটাইজার ও জীবাণুনাশক সাবান পাঠাতে বলা হয়েছে। 



Post a Comment

0 Comments