আমরা নিজেরাই কি ধ্বংস করছি না?

totthoMia
পদ্মা নদী 
লিখেছেন: 
মো: সদর আলী মোল্লা 
হাবি: অবঃ বিজিবি 
মোবাইল: ০১৭২০-৩৪২৩০৮

কৈ, শিং, টেংরা পুটি হাজার প্রজাতির মাছ থাকবে ইলিশ কেন জাতীয় মাছ। এই প্রশ্নটা নিয়ে মনে মনে ভাবতাম। ২০১৮ সালে বুঝতে পারলাম বিশ্বের সব দেশের চেয়ে বাংলাদেশেই বেশি ইলিশ মাছ জন্মায়। তাই ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ।





সব ধর্মের মানুষের কাছে ইলিশ খুব প্রিয় মাছ। মানুষ অন্যান্য মাছ চাষ করে। পদ্মা মেঘনা যমুনা ইলিশ প্রাকৃতিকভাবেই চাষ হয়। বাংলাদেশকে ইলিশের খামার বললে আমার মনে হয় ভুল হবেনা। পদ্মার রুপালি ইলিশ বিশ্বের নামকরা।

সৌদি আরব কুয়েত ইরাকে তেলের খনি আছে। রাষ্ট্রীয় খরচে সিংহভাগ যোগায় তেলের পয়সায়। কোন কোন দেশে কয়লার খনি, স্বর্ণের খনি আছে। আমাদের যে একটা রুপালি ইলিশের খনি আছে তা আমরা মনেই করি না।

সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে বাংলাদেশও একদিন ইলিশের পয়সায় সৌদি তেলের পয়সাকে অতিক্রম করবে। বিভিন্ন পয়েন্টে যে পরিমাণ ইলিশের ডিম নষ্ট হয় তা রক্ষা করতে পারলে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা নয় সারা বছর আমরা ১০০ টাকা কেজি দরে ইলিশ খেতে পারব। বাংলাদেশের ৫০% আমিষের চাহিদা মিটাবে এই রুপালি ইলিশ।

ইলিশ মাছ 
ঈদ-পূজা পূর্ণিমা ও বড়দিনের পর বাংলাদেশে একটা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যার নাম পহেলা বৈশাখ। সকল ধর্মের লোকেরা মিলেমিশে এই অনুষ্ঠানটি পালন করে। যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আছে কিনা সন্দেহ। ঐদিন ইলিশ বিহীন পান্তার প্লেট অসম্পন্ন থাকে।

শতভাগ বাঙালিয়ানার প্রমাণ ১লা বৈশাখের পান্তা-ইলিশ। ইলিশের বহুগুণ, বহু স্বাদ এতদ্বসত্ত্বেও ইলিশ অবহেলিত। আমরা (বাংলাদেশ) রুপালি ইলিশ নিয়ে খনি নির্ভর দেশ গুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় যেতে চাই।

আমার অবস্থান ঢাকার মিরপুরে। বাপ দাদার বাড়ি মাদারীপুর জেলা, কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিনে। দুই তিন মাস পর পর ৫-৭ দিনের জন্য আমি গ্রামে গিয়ে থাকি। ১৪ থেকে ১৯ অক্টোবর ২০১৮ গ্রামে থেকেছি। ইলিশ মাছের দুরবস্থা দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছে। ঢাকায় ফিরে ও ভুলতে পারছিনা, তাই প্রকাশ করলাম।

ইলিশ মাছ ধরা 
উল্লেখ্য ২৯ অক্টোবর ২০১৮ পর্যন্ত ২২ দিন ছিল ইলিশ ধরা সরকারি নিষেধ। ১লা নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৮ মাস জাটকা (৯" কম সাইজের) ইলিশ আহরণ ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আদেশ অমান্যকারীদের ২ বছর কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা। বলে রাখা ভালো, মৎস্য ক্ষেত্রে শৃংখলার জন্য আমাদের রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মৎস্যভবন, উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীসহ বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর পরেও আমরা ইলিশ রক্ষা করতে পারছিনা।

গ্রামে গিয়ে যা দেখলাম ১৪-১০-২০১৮ইং তারিখে পৌঁছানোর পর রাত্রে খাবার টেবিলে ৪-৫ পিস ইলিশ মাছ, সাথে প্রায় ৮-৯" লম্বা একটা ডিম পেলাম। প্রথমে  মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার কথা আমার স্মরণে ছিলনা। শাশুড়ি মার মুখে মাছের দুরবস্থার কথা শুনে আর মাছ খাওয়া হলো না। ক্রমেই সময় যাচ্ছে আর আমার মনে হচ্ছে মাছটা অভিযোগ করছে কেন তাকে হত্যা করা হলো।

২২ দিন পর খালার বাড়ি গেলাম, দেখলাম ইলিশ মাছ ভাজা। খালা বলল, "এই গুলি ডিমওয়ালা মাছ নয়, নিষেধাজ্ঞার আগে বাজার থেকে কেনা"। নিষেধাজ্ঞার সময় বাজারে ইলিশ বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় রাস্তার বাকে, ফসলের মাঠে, বাগানে, পুকুরপাড়। অবিশ্বাস্য জায়গায় ইলিশ মাছ বিক্রি হয়। পুরুষের চেয়ে মহিলা ক্রেতা বেশি। ২-৩জন দলবদ্ধ হয়ে মাছ কিনে। চুপি চুপি ফিসফিস করে কথা বলে। দেখে বুঝা যায় এ যাত্রায় ৫দিন গ্রামে থেকে যা বুঝতে পারলাম, কিছু অসৎলোক যোগসাজশের মাধ্যমে গোপনে চুরি করে ডিমওয়ালা মাছ ধরে এবং অল্প দামে বিক্রি করে।

ডিমওয়ালা ইলিশ মাছ 
প্রত্যেকটি মাছ ডিমে পেটভরা। দেখলে যেকোন সচেতন মানুষের খারাপ লাগবে। আশেপাশের মানুষ কিনে ফ্রিজে ভরে রাখে। তারা বলে আমি না কিনলে আরেকজন কিনবে, বিক্রি থেমে থাকবে না।

আমি কয়েকজনকে বললাম আপনি না কিনলে ওরা বিক্রি করতে পারবেনা, আর বিক্রি না করতে পারলে ধরবে না। প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের উচিত এসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট সকলকে নিরুৎসাহিত করা। এদের মধ্যে অপেশাদার জেলার সংখ্যা প্রায় অর্ধেক।

এরা ডিমওয়ালা ইলিশ ধরে বালুর ভেতর পুতে রাখে। নিষেধাজ্ঞার সময় পার হলে বাজারে বিক্রি করে। কেউ কেউ বলে আমরা না ধরলে এই মাছ ভারতে চলে যাবে। আমি তাদের অবগতির জন্য স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ইলিশ গভীর পানির মাছ সাগর ও নদীর মোহনায় এদের বিচরণস্থল শুধুমাত্র ডিম ও বাচ্চা নিরাপত্তার জন্য খরস্রোতা মিঠাপানিতে আসে। ডিম ছেড়ে ফিরে যায় মোহনায়।

লোকমুখে শুনেছি, ২০১৭ সালে একজন সিএনজিচালক আকস্মিকভাবে ইলিশ মাছ কিনে ৮০০০ টাকা লাভ করে। পরের বছর ২০১৮ সালে মাছ নিয়ে ধরা পড়ে ৭০ হাজার টাকা লোকসান দেয়। লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। ডিম নষ্ট করা পাপ, এই পাপ কাজে জনসাধারণকে নিরুৎসাহিত করতে পারলেই আমরা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

শেষ নবীর উম্মত হিসেবে আমাদের প্রতি নির্দেশ আছে, ভালো কাজে উৎসাহ দেয়া এবং মন্দ কাজে নিষেধ করা। প্রিয় পাঠক আসুন আমরা এই নির্দেশ পালন করে দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে অবদান রাখি।

জাটকা ইলিশ মাছ 
আর কয়েকদিন পর শুরু হবে জাটকা শিকার গত বছর দেখেছি জাটকা কমবেশি ৪০ টা ১ কেজি হয়, যা এক পরিবারের খাদ্য। বড় হলে ৪০ কেজি হতো এবং ৪০টি পরিবার খেতে পারত।



কি করে জাটকা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, ভোলাহয়ে ঢাকায় আসে। রাস্তায় কি কেউ দেখেনা। সংশ্লিষ্ট এলাকা গুলির নিকটবর্তী মসজিদ-মাদ্রাসার খতিব ও ইমাম সাহেবের নিকট আমার একটাই আবেদন আপনারা রাষ্ট্রকে ২ মিনিট সময় দেন। ইলিশের দুরবস্থা বর্ণনা করে গণসচেতনতা সৃষ্টি করেন। কারণ দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ এবং দেশের উন্নয়ন ও নাগরিকের সুখ-শান্তি একই সুতায় গাঁথা।

Post a Comment

0 Comments