যে গান শুনলে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে

যে গান শুনে না, সে নাকি মানুষও খুন করতে পারে। অথচ সে গান ই নাকি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। এমনটাও কি হতে পারে। হ্যাঁ ঠিক এমনটাই হয়েছিল বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের। কি সেই গান?



সময়টা ১৯৩৩ সাল। হাঙ্গেরীয়ান কবি জাভিয়ের আর মিউজিক কম্পোজার আর গায়ক পল কেলমার মিলে সৃষ্টি করেছিলেন এক অসাধারণ গান। গানটির নাম গ্লুমি সানডে বা বিষণ্ন রবিবার'।এই গানটি সমস্ত বিশ্বজুড়ে পরিচিত সুইসাইড সং' বা আত্মহত্যার গান।

কিভাবে তৈরি হলো এই গান?

১৯৩৩ সাল। সময়টা তখন দ্যা গ্রেট ডিপ্রেশনের।  পুরো বিশ্বজুড়ে চলছে অর্থনৈতিক মন্দা। বড় বড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দিনমজুর শ্রেণী-পেশার মানুষ পর্যন্ত নিমজ্জিত হয়েছিল এক হতাশার সমুদ্রে। ইউরোপের দেশগুলো খুব খারাপভাবে শিকার হয়েছিল ফ্যাসিজমের। শুরু হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ। 

এমনই এক পরিবেশে প্রেমিকার সাথে সদ্য ছাড়াছাড়ি হওয়া জাভিয়ের নামের এক হাঙ্গেরীয়ান কবি লিখতে বসলো এক বিষন্ন রবিবারের গল্প। গল্পের নায়ক এক যুবক। বিষন্ন রবিবারে বসে ভাবতে থাকে তার প্রেমিকার কথা যে কিছুদিন আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে । সেই বিষন্ন রবিবারে যুবকের সময় কাটতে থাকে অসংখ্য বেদনাদায়ক ছায়াদের সাথে। যুবক ভাবে কোনভাবেই তার প্রেমিকাকে মৃত্যুপরবর্তী দুনিয়া থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না কিন্তু প্রেমিকার মতোই এখন যদি সে নিজেও মারা যায় তবে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে প্রেমিকার সাথে তার দেখা হবে। তাই সে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ, এক বিষণ্ন রবিবারে সে ঝাঁপ দেয় নদীতে।

বিষণ্ণতা 
সেরিজ নামে একজন প্রতিষ্ঠিত সুরকার এই গানটির সুর করেন। আর গানটি রেকর্ড করা হয় পল কেল্মার  এর কন্ঠে। প্রাথমিকভাবে গানটি প্রকাশিত হয় সিট মিউজিক বার সংগীতের লিখিত আকারে। প্রকাশনার সাথে সাথে হাঙ্গেরি সহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় জনপ্রিয়তা পায় এটি। একই সাথে হাঙ্গেরিতে আত্মহত্যা সংখ্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। 

কবি জাভিয়ারের প্রাক্তন প্রেমিকা সহ আরো অনেকেই নদীতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করে এবং তাদের হাতে ধরা ছিল বিষণ্ন রবিবার' গানটির লিখিত কপি। সে বছরই হাঙ্গেরিতে ভীষণ রবিবার নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও বিষন্ন রবিবার স্থান করে নেয় অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।

কিভাবে বিখ্যাত হলো গানটি ?

খুব শীগ্রই এই গানটি সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে এবং অনুবাদ হতে থাকে বিভিন্ন ভাষায় ১৯৩৫ সালে রাশিয়া এবং ১৯৩৬ সালে ফ্রান্স ও জাপান এই গানটি তাদের নিজস্ব ভাষায় অনুবাদ করে। তবে এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত গানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হিট করে ১৯৪১ সালে গায়িকা বিলি হলিডের কণ্ঠে ধারণ করা ইংরেজি অনুবাদ টি । যার নাম দেওয়া হয় গ্লুমি সানডে।

তবে এই গানটির প্রভাবে মানুষ আসলে আত্মহত্যা করেছে কিনা তা নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে প্রেস রিপোর্ট অনুযায়ী গানটি প্রকাশের সময় হাঙ্গেরিতে ১৯টি আত্মহত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়।  কিন্তু সেগুলো পেছনে আসলেই গানের প্রভাব রয়েছে কিনা সেটা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।  অনেকে মনে করেন গ্রেট ডিপ্রেশন এর প্রভাব সেই সময়ে অর্থনৈতিক মন্দা মানুষের জীবনযাত্রায় এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে তারা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে চলে যেতে দ্বিধা করেনি । 

কেন নিষিদ্ধ হয়েছিলো গানটি
আবার অনেকে মনে করে এটি ছিল গানটি জনপ্রিয় করার আরেকটি কৌশল। কিন্তু এটা যদি সম্পূর্ণ একটি নিছক গুজব হতো তাহলে কেন সরকার এটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। কেন বিভিন্ন দেশে বহু বছর নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে । 


এটি  বেশি ডালপালা মেলে ধরে গানটি রচনার আরও ৩৫ বছর পর। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে শেরেস জানালা দিয়ে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন সেবার ব্যর্থ হলেও সফল হন দ্বিতীয় প্রচেষ্টায়।  এই ঘটনার পর বিলি হলিডের করা সংস্করণটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছে বিবিসি।  শুধুমাত্র যান্ত্রিক সংস্করণটি পরিবেশনের সম্মতি দেওয়া হয়।অবশেষে ২০০২ সালে বিবিসি তাদের এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

শেষকথা 

আত্মহত্যার ব্যাপারটি গুজব হোক বা না হোক এই গানটি শোনার সময় শ্রোতার মনে রকমের বিষন্নতা জেঁকে ধরে।  একবার শুনলে বারবার শুনতে চায়।  সেই সঙ্গে বেড়ে ওঠে মনের বিষণ্ন্নতা। এমন বিষণ্ন মনে আত্মহত্যার ইচ্ছা জায়গা কি অস্বাভাবিক নয় আর সেজন্যই বিষণ্ন রবিবার' সকলের কাছে হয়ে উঠেছে আত্মহত্যার গান।

Post a Comment

0 Comments